ডিজিটাল আইনে ওসির বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে নুসরাতের পরিবার

ডিজিটাল আইনে ওসির বিরুদ্ধে মামলা করতে পারে নুসরাতের পরিবার

এপ্রিল ১১, ২০১৯ 0 By আরসিএন২৪বিডি.কম

ফেনীর সোনাগাজী ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদরাসার শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান রাফি যৌন হয়রানির অভিযোগ করতে গিয়ে ফেনীর সোনাগাজী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) কক্ষে আরেক দফা হয়রানির শিকার হয়েছিল।

রাফি যখন অভিযোগ করতে ওসির কাছে গিয়েছে তখন তাকে দেখা যায় যে কথা গুলো বলতে সে ইতস্ততঃ বোধ করছে ।

তবে কোন মতেই ঔই থানার ওসি রাফির উপর সহানুভূতি দেখায়নি । বরং বার বার রাফির মুখ থেকে হাত সরাতে বলেন ।
ওসি একের পর এক জেরা করতে করতেই নুসরাতের বক্তব্য ভিডিও করেন। এই মৌখিক অভিযোগ নেওয়ার সময় দুই পুরুষের কণ্ঠ শোনা গেলেও সেখানে নুসরাত ছাড়া অন্য কোনও নারী বা তার আইনজীবী ছিলেন না।

আইনজীবীরা বলছেন, যৌন হয়রানির অভিযোগ করার সময় ওসির ভিডিও ধারণের ঘটনায় তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে মামলা করাতে পারে নুসরাতের পরিবারের।
ওসির এ ধরনের আচরণের বিষয়ে পুলিশ কর্তৃপক্ষ বলছেন, আইন না মেনে অভিযোগ করতে যাওয়া কারোর ভিডিও করলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে।
রাফির দেওয়া বক্তব্য যখন ভিডিও করা হয় সে সময় রাফি অঝোরে কাঁদছিলেন এবং তার মুখ দু’হাতে ঢেকে রেখেছিলেন।

বারবারই ‘মুখ থেকে হাত সরাও, কান্না থামাও’ বলার পাশাপাশি তিনি এও বলেন, ‘এমন কিছু হয়নি যে এখনও তোমাকে কাঁদতে হবে।’

দায়িত্বে অবহেলার দায়ে গত ৯ এপ্রিল ফেনীর সোনাগাজী মডেল থানার পরিদর্শক (ওসি) মোয়াজ্জেম হোসেনকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।

তবে কে এই ভিডিও করেছিল সে সময় এমন প্রশ্নের জবাবে সোনাগাজী থানার ওসি (তদন্ত) বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা ছিল না। আজকে অনেকে বিষয়টি জানতে চেয়ে ফোন করায় আমি জানতে পেরেছি।’

অভিযোগের সময় ভিডিওতে রাফিকে দেখা যায়, থানার ভেতরে নুসরাতকে জেরা করা হচ্ছে—‘কিসে পড়া? ক্লাস ছিল?’ ঘটনা জানাতে গিয়ে নুসরাত বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন।

সে সময় তাকে জিজ্ঞাসা করা হয়—‘কারে কারে জানাইসো বিষয়টা?’ নুসরাত যখন জানায় তাকে অধ্যক্ষ ডেকে নিয়ে গিয়েছিল, তখন প্রশ্ন করা হয়—‘ডেকেছিল, নাকি তুমি ওখানে গেছিলা?’ পিয়নের মাধ্যমে ডেকেছিল বলে নুসরাত জানালে প্রশ্ন করা হয়—‘পিয়নের মাধ্যমে ডেকেছিল? পিয়নের নাম কী?’ নুসরাত সে সময় পিয়নের নাম বলেন—‘নূর আলম।’

পুরো ভিডিও’তে দেখা যায় নুসরাত কাঁদছিলেন। একসময় ভিডিওধারণকারী তাকে ধমকের সুরে বলে—‘কাঁদলে আমি বুঝবো কী করে, তোমাকে বলতে হবে। এমন কিছু হয়নি যে তোমাকে কাঁদতে হবে।’

ভিডিও’র শেষে নুসরাতের কথা বলা শেষ হলে ধারণকারী বলেন—‘এইটুকুই?’ আরও কিছু অশালীন উক্তির পাশাপাশি তাকে উদ্দেশ করে ওই ব্যক্তি বলেন—‘এটা কিছু না, কেউ লিখবেও না তোমার কথা। আমি আইনগত ব্যবস্থা নেবো। কিছু হয়নি। রাখো। তুমি বসো।’

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সূত্রে জানা যায়,
যৌন হয়রানির অভিযোগ করার ভিডিও ধারণের বিষয়ে ওসির বিরুদ্ধে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে মামলা করার সুযোগ রয়েছে।

আরো জানা যায়, “হয়রানির শিকার নুসরাতের ভিডিও ধারণ করার ঘটনাটি ডিজিটাল সিকিউরিটি অ্যাক্টের ২৬ ধারা অনুসারে ফৌজদারি অপরাধ।
নুসরাতের পরিবার যদি মনে করে, তবে সংশ্লিষ্ট ওসি’র বিরুদ্ধে ওই ধারায় মামলাও করতে পারবেন।”

পুলিশের এআইজি (মিডিয়া অ্যান্ড পিআর) মো. সোহেল রানা বলেন, ‘যদি কোনও রূঢ় অশালীন উপায়ে সুনির্দিষ্ট আইনিপন্থা না মেনে এ ধরনের কোনও ভিডিও করা হয়ে থাকে, তাহলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে। এটি তার ব্যক্তিগত বিচ্যুতি।’

প্রসঙ্গত, নুসরাত জাহান রাফি সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার আলিমের পরীক্ষার্থী।

ওই মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলা এর আগে তাকে যৌন নিপীড়ন করে বলে অভিযোগ ওঠে।

এ অভিযোগে নুসরাতের মা শিরিন আক্তার বাদী হয়ে গত ২৭ মার্চ সোনাগাজী থানায় মামলা দায়ের করেন।

এরপর অধ্যক্ষকে গ্রেফতার করে পুলিশ। অধ্যক্ষকে গ্রেফতারের পর মামলা তুলে নিতে বিভিন্নভাবে নুসরাতের পরিবারকে হুমকি দেওয়া হচ্ছিল।

গত ৬ এপ্রিল সকাল ৯টার দিকে আলিম পর্যায়ের আরবি প্রথমপত্র পরীক্ষা দিতে সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসা কেন্দ্রে যান নুসরাত।

এ সময় তাকে কৌশলে একটি বহুতল ভবনে ডেকে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। সেখানে তার গায়ে দাহ্য পদার্থ দিয়ে আগুন দেওয়া হয়।

গত বুধবার (১০ এপ্রিল) রাত সাড়ে ৯টায় ঢামেক হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নুসরাত মারা যান।

নুসরাতের গায়ে আগুন দেওয়ার ঘটনার পর গত ৮ এপ্রিল তার বড় ভাই মাহমুদুল হাসান নোমান বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন আইনে সোনাগাজী থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলা নম্বর ১০।

আসামিদের মধ্যে পলাতক রয়েছে—সোনাগাজীর পৌর কাউন্সিলর মুকছুদ আলম, অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলার অন্যতম সহযোগী নূরউদ্দিন, ওই মাদ্রাসার ছাত্র সোনাগাজী পৌরসভার উত্তর চরচান্দিয়া গ্রামের বাসিন্দা শাহাদাত হোসেন শামীম, জাবেদ হাসান ও আব্দুল কাদের।

গতকাল বুধবার অধ্যক্ষ সিরাজউদ্দৌলাকে ৭ ও তার দুই সহযোগী মাদরাসার ইংরেজি বিভাগের প্রভাষক নূরুল আফসার উদ্দিন ও ছাত্র আরিফুল ইসলামকে ৫ দিন করে রিমান্ডে পাঠিয়েছে সোনাগাজী উপজেলা আমলি আদালত।

গত ৮ এপ্রিল নুসরাতের ভাই মাহমদুল হাসান নোমানের করা নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলায় এখন পর্যন্ত ৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

ওসির গাফিলতি প্রমাণ হলে রেহাই পাবেন না : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

আরসিএন২৪বিডি/ সময়: ২২৩০ঘণ্টা, বৃহস্পতিবার ১১ এপ্রিল ,২০১৯