বিদায়ী ঘন্টা মুহাররম জেনে নিন অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণমাস

বিদায়ী ঘন্টা মুহাররম জেনে নিন অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণমাস

অক্টোবর ৮, ২০১৮ 1 By আরসিএন২৪বিডি.কম

আজ ২৭ মহররম হিজরি ১৪৪০ সনের আরবী বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস হলো মহররম , এ মাসের ছিল অনেক ফজিলত ও মাহাত্ম্য। আল্লাহর কাছে যে চারটি মাসে যুদ্ধবিগ্রহ করা হারাম, মহররম তার মধ্যে অন্যতম।

 


কুরআনের ভাষায় এটি ‘আরবাআতুন হুরুম’-অর্থাৎ চার সম্মানিত মাসের অন্যতম। আল্লাহতালা আমাদের সকলকে আগামী হিজরীর ১৪৪১ সনের মহররম মাসে ইবাদত করার তৌফিক দান করুন , তাই জেনে নিন অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণমাস সম্পর্কে।

 

“মুহররমুল হারাম”:

আপনি জানেন কি “মুহররমুল হারাম” বলা হয়েছে কেন ? আরবী বছরের বা হিজরী সালের প্রথম মাসকে বলা হয় “মুহররমুল হারাম”। অর্থাৎ সন্মানিত মুহাররাম মাসকে বুঝায়। আল্লাহতালা যে চারটি আরবী মাসকে সন্মানিত করেছেন তার মধ্যে মুহররমুল হারাম মাস একটি।অনেক আগথেকে উম্মতের জন্য সবচেয়ে সন্মানি রোজা ছিল এই মাসের রোজা।
এই রোজাকে আশুরার রোজা বলা হয়।তখনকার সময় ফরজ রোজার পরপরই তাহাদের নিকট সবচেয়ে বেশি দামী ছিলো আশুরার রোজা। বর্তমান আমাদের জন্য ফরজ রোজার পরপরই নফল রোজার মধ্যে সবচেয়ে দামী হয় আরাফার রোজা (যিলহাজ্জ মাসের ৯ম তারিখ)। আশুরার রোজা রাখার বিশেষ সুফল হলো আপনার পেছনের যিন্দেগীর এক বছরের গুনাহ মাফ হয়ে যায়। ইয়াহুদিরা বলে মুসা আ. এর যুগ থেকে এই রোজা প্রচলিত ছিল আসলে তা নয়। আর কিছু মুসলমান নামধারী শি‘আ যারা সত্যিকার অর্থে কাফের তারা বলে থাকে যে আশুরা সন্মানী নাকি ইমাম হুসাইন রা. এর সময় থেকে প্রচলিত ছিল। আমাদের সমাজের কিছু সরলমনা ইলেমবিহীন সাধারণ মুসলমান এই  শি’আদের সাথে তাল মিলিয়ে তাই বিশ্বাস করেন। তাদের ধারনা ছিল যে  এই দিনেই  ইমাম হুসাইন রা.শহীদ হয়েছে বলে তাই এই দিনের এতোই  মর্তবা দেয়া হয়। অথচ তারা জানে না আশুরার ফজিলত শুরু হয়েছে আদম (আ.) এর যুগ থেকেই। আগেই বলা হয়েছে যে আগের উম্মতের জন্য এই দিনে রোজা রাখা নফলের দিক দিয়ে অনেক দামী ছিল। আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম এই মাসের মর্তবার ব্যপারে ইমাম হুসাইন রা. এর শহীদ হওয়ার অনেক আগেই বলে গিয়াছেন। সুতরাং আমরা যদি এভাবে বলতে পারি যে এই দিনটি অনেক আগেই থেকেই দামী আর আল্লাহ রব্বুল ‘আলামীন, শহীদের সর্দার ইমাম হুসাইন রা. এর মর্জাদা আরো বাড়ানোর উদ্দেশ্যে এই দিনটি বিশেষভাবে পছন্দ করেছেন। এর মাধমে যেমন সঠিক কথা বলা হলো এবং অপরদিকে ইমাম হুসাইন রা. সন্মানকে মানুষের নজরে আরো উচুঁ করে তুলে ধরা যায়।আমাদের সকলেরই মৃত্যু আসবে এটি যেমন চিরন্তসর্তী। তেমনি আল্লাহতালা যদি কোন মোমিনের মৃত্যু শুক্রবারে নির্ধারণ করে থাকে এর দ্বারা বুঝায় ঐ মোমিনের মর্তবা,শুক্রবারের নহে। ঠিক তেমনি যদি কোনো মোমিনের সোমবারে মৃত্যুবরণ করে তবে আরো দাম বাড়বে।কারণ  শুক্রবার থেকে সোমবারে মৃত্যু মোমিনের জন্য বেশী বরকত সম্পূর্ণ।

নিম্নে মুহাররাম মাসের ১০ তারিখ বা আশুরার তাৎপর্য, ফযীলত, করণীয় ও বর্জনীয় সম্নন্ধে আলোচনা করা হলো।

আশুরা :

আশুরা সাধারণত মুহাররম মাসের ১০ তারিখকে বলা হয়। ইসলাম ধর্মে এই দিবসটিকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়।কারণ ইসলামের অনেক ঐতিহাসিক ও তাৎপর্য পূর্ণ ঘটনাবলী সংঘটিত হয়ে ছিল এই বিশেষ দিনে।

ফযীলত :

১. হযরত আবূ কাতাদাহ রাযি.থেকে বর্ণিত হয় যে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “আমি আশাবাদী যে, আশুরার দিনের রোযার উসীলায় আল্লাহ তা‘আলা অতীতের এক বৎসরের গুনাহ মাফ করে দিবেন।” (তিরমিযীঃ হাঃনং ৭৫১)
২. হযরত আবূ হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত হয় অপর হাদীসে নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “রমাযানের রোযার পর মুহাররম মাসের রোযা সর্বোত্তম।” (মুসলিমঃ হাঃ নং ১১৬৩)

করণীয় :

১. আশুরার দিনে রোযা রাখার এর সাথে ৯ তারিখ বা ১১ তারিখ মিলিয়ে রাখা।  কারণ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, “তোমরা আশুরার দিনে রোযা রাখ। তবে এ ক্ষেত্রে ইয়াহুদীদের থেকে ভিন্নতা অবলম্বন করতঃ তোমরা আশুরার পূর্বে অথবা পরের একদিন সহ রোযা রাখবে।” (মুসনাদে আহমাদ-হাঃ নং ২৪১)
২. এই দিন  বেশী বেশী করে মোমিনদের তাওবা-ইস্তিগফার পাঠ করা উচিত। কারণ নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ”মুহাররম হলো আল্লাহ তা‘আলার (নিকট একটি মর্যাদাবান) মাস। এই মাসে এমন একটি দিন আছে, যাতে তিনি অতীতে একটি সম্প্রদায়কে ক্ষমা করেছেন এবং ভবিষ্যতেও অপরাপর সম্প্রদায়কে ক্ষমা করবেন”। (তিরমিযীঃ নং ৭৪১)
৩. এই দিনে হযরত হুসাইন রাযি. দীনের খাতিরে যে ত্যাগ-তিতিক্ষা প্রদর্শন করেছেন তা থেকেই সকল মুসলমানের  শিক্ষা গ্রহণ করা উচিত দীনের জন্য যে কোন ধরনেরই ত্যাগ ও কুরবানী পেশ করার।

বর্জনীয়

১. তা’যিয়া বানানো অর্থাৎ, হযরত হুসাইন রাযি. এর নকল কবর বানানো চেষ্টা মাত্র। ইহা বস্তুত এক ধরণের ফাসেকী শিরকী কাজ যা করা নিষিদ্ধ। কোনো কারণ ছাড়াই মূর্খ লোকেরা ‘হযরত হুসাইন রাযি. এতে খমাসীন হন’ এই বিশ্বাসে এর পাদদেশে নযর-নিয়ায পেশ করে থাকে, এর সামনে হাত জোড় করে দাঁড়ায়, এর দিকে পিঠ প্রদর্শন করাকে বেয়াদবী মনে করে, তা’যিয়ার দর্শনকে ‘যিয়ারত’ বলে আখ্যা দেয়।এছাড়াও নানা রকমের পতাকা ও ব্যানার টাঙ্গিয়ে মিছিল করা; যা সম্পূর্ণ নাজায়িয ও হারাম বলে আক্ষায়ীত। আরোও বহুবিধ কুপ্রথা ও গর্হিত কাজের সমষ্টি হচ্ছে এ তা’যিয়া। (ইমদাদুল ফাতাওয়াঃ ৫/২৯৪,৩৩৫, কিফায়াতুল মুফতীঃ ৯/৩২, ফাতাওয়ায়ে রহীমিয়াঃ ২/৩৪৩)
সর্তটা : তা’যিয়ার সামনে যে সমস্ত নযর-নিয়ায পেশ করা হয় তা গাইরুল্লাহর নামে উৎসর্গ করা হয় বিধায় তা খাওয়া হারাম। (সূরা মাইদাহঃ ৩)
২. মর্সিয়া বা শোকগাঁথা পাঠ করা, এর জন্য মজলিস করা এবং তাতে অংশগ্রহণ করা সবই নাজায়িয। (ইমদাদুল ফাতাওয়াঃ ৫/২৯৪, কিফায়াতুল মুফতীঃ ৯/৩২, ৪২)
৩. ‘হায় হুসেন’, ‘হায় আলী’ ইত্যাদি বলে বলে বিলাপ ও মাতম করা এবং ছুরি মেরে নিজের বুক ও পিঠ থেকে রক্ত বের করা। এগুলো করনেওয়ালা, দর্শক ও শ্রোতা উভয়ের প্রতি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম অভিসম্পাত করেছেন। (আবূ দাউদ, হাঃ নং ৩১২, ইবনে মাজাহঃ হাঃ নং ১৫৮৪)
৪. কারবালার শহীদগণ পিপাসার্ত অবস্থায় শাহাদতবরণ করেছেন তাই তাদের পিপাসা নিবারণের জন্য বা অন্য কোন বিশেষ উদ্দেশ্যে এই দিনে লোকদেরকে পানি ও শরবত পান করানো। (ইমদাদুল ফাতাওয়াঃ ৫/২৮৯, কিফায়াতুল মুফতীঃ ৯/৪০)
৫. হযরত হুসাইন রাযি. ও তাঁর স্বজনদের উদ্দেশ্যে ঈছালে সাওয়াবের জন্য বিশেষ করে এই দিনে খিচুড়ি পাকিয়ে তা আত্মীয়-স্বজন ও গরীব মিসকীনকে খাওয়ানো ও বিলানো। একে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষ যেহেতু নানাবিধ কু-প্রথায় জড়িয়ে পড়েছে তাই তাও নিষিদ্ধ ও না-জায়িয। (কিফায়াতুল মুফতীঃ ৯/৪০)
৬. হযরত হুসাইন রাযি.-এর নামে ছোট বাচ্চাদেরকে ভিক্ষুক বানিয়ে ভিক্ষা করানো। এটা করিয়ে মনে করা যে, ঐ বাচ্চা দীর্ঘায়ু হবে। এটাও মুহাররম বিষয়ক কু-প্রথা ও বিদ‘আত। (ইসলাহুর রুসূম)
৭. তা’যিয়ার সাথে ঢাক-ঢোল ও অন্যান্য বাদ্যযন্ত্র বাজানো।(সূরায়ে লুকমানঃ ৬)
৮. আশুরার দিনে শোক পালন করা; চাই তা যে কোন সূরতেই হোক। কারণ শরীয়ত শুধুমাত্র স্বামীর মৃত্যুর পর বিধবা স্ত্রীর জন্য ৪ মাস ১০ দিন আর বিধবা গর্ভবতীর জন্য সন্তান প্রসব পর্যন্ত এবং অন্যান্য আত্মীয়-স্বজনের মৃত্যুতে সর্বোচ্চ ৩ দিন শোক পালনের অনুমতি দিয়েছে। এই সময়ের পর শোক পালন করা জায়িয নেই। আর উল্লেখিত শোক পালন এগুলোর কোনটার মধ্যে পড়ে না। (বুখারীঃ হাঃ নং ৫৩৩৪, ৫৩৩৫, ৫৩৩৬, ফাতাওয়ায়ে রহীমিয়াঃ ২/৩৪৪)
উল্লেখ্য যে শরীয়ত কর্তৃক অনুমোদিত শোক পালনের অর্থ হলো শুধুমাত্র সাজ সজ্জা বর্জন করা। শোক পালনের নাম যাচ্ছেতাই করার অনুমতি শরী‘আতে নেই। (দুররে মুখতারঃ২/৫৩০)
৯. শোক প্রকাশ করার জন্য কালো ও সবুজ রঙের বিশেষ পোশাক পরিধান করা। (ফাতাওয়ায়ে রহীমিয়াঃ ২/৩৪৪)
১০. এই দিনের গুরুত্ব ও ফযীলত বয়ান করার জন্য মিথ্যা ও জা‘ল হাদীস বর্ণনা করা। কারণ হাদীসে মিথ্যা হাদীস বর্ণনাকারীকে জাহান্নামে ঠিকানা বানিয়ে নিতে বলা হয়েছে। (বুখারীঃ হাঃ নং ১০৭)
আশুরার দিনের উপরের  ১০টি বর্জনীয়, নিন্দিত ও গর্হিত কাজসমূহের কিছু অতি সামান্য নমুনা পেশ করা হলো মাত্র। তাহলে মূলকথা হলো যে, বক্ষ্যমাণ পর্চার ‘করনীয়’ শিরোনামের অধীনে উল্লেখিত ৩টি আমল এই দিনে আর কোন বিশেষ আমলের কথা শরী‘আতে প্রমাণিত নেই বলে জানে যায়। তাই এইগুলো ব্যতীত অন্য কোন আমল আশুরাকে কেন্দ্র করে  বিশেষ যে কোন কাজই করা হবে তা বিদ‘আত ও মনগড়া আমলে পরিনিত হবে বলে জানা যায়। তাই আমরা সকলেই দুআ করি সবার জন্যই যেন আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সকলকে শিরক, বিদ‘আত ও গুনাহের কাজ থেকে বিরত থাকার তাওফীক দান করুন, ”আমিন”।

আরসিএন ২৪ বিডি / ইসলাম ডেস্ক তথ্য

আগের খবর