ঈদে মিলাদুন্নবী সম্পর্কে কি বলা হয়েছে জেনে রাখুন

ঈদে মিলাদুন্নবী সম্পর্কে কি বলা হয়েছে জেনে রাখুন

নভেম্বর ২১, ২০১৮ 0 By আরসিএন২৪বিডি.কম

ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) এই দিন আসলে কি বা কি বুজানো হয়েছে ।

এই দিন কি করতে হয় তা নিয়ে লেখা আজ ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) ।

 

প্রথমে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) অর্থ সম্পর্কে ব্যাখ্যা করা হল ঈদ মানে খুশি আর মিলাদ মানে জন্ম ।

ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) আরবি শব্দ।

‘ঈদ’ সম্পর্কে বিশ্বখ্যাত আরবি অভিধান আলমুনজিদের ৫৩৯ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে,

কোন কোন মর্যাদাবান ব্যক্তি বা গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে কেন্দ্র করে সমবেত হওয়ার দিন বা স্মৃতিচারণের দিবসই ঈদ।

কাওয়াইদুল ফিকহ্এর ৩৯৬ পৃষ্ঠায় ঈদকে ‘ঈদ‘ বলার কারণ বলা হয়েছে, প্রতিবছর আনন্দ নিয়ে তা ফিরে আসে।

মিলাদ‘ সম্পর্কে আলমুনজিদের ৯১৮ পৃষ্ঠায় বলা হয়েছে, ‘মিলাদ’ অর্থ জন্ম সময়, যা কারো ঐ দিবসে পরবর্তীকালে শুকরিয়া হিসাবে পালন করা হয়।

আল্লামা ইবনে মানযুর (রহ.) তার প্রসিদ্ধ অভিধান ‘লিসানুল আরব’ লিখেছেন, ‘লোকটির মিলাদ’ মানে যে সময়ে সে জন্মগ্রহণ করেছে সে সময়ের নাম।

স্বভাবতই ‘মিলাদ’ বা ‘মিলাদুন্নবী’ বলতে শুধুমাত্র নবীজী (সা.)এর জন্মের সময়ের আলোচনা, জীবনী পাঠ, তাঁর বাণী, তাঁর শরিয়ত বা তাঁর হাদিস আলোচনা, তাঁর আকৃতিপ্রকৃতি আলোচনা,

তাঁর উপর একাকী বা সম্মিলিতভাবে দরুদ শরীফ পাঠ, সালাম পাঠ, কিয়াম ইত্যাদি বুঝায়। আলকুরআনে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) :

মহান আল্লাহ পাকের বিশেষ কোন রহমত ও নিয়ামত দানের দিনকে ঈদরূপে পালন করার সুস্পষ্ট প্রমাণ আলকুরআন।

ইরশাদ হয়েছে, “হজরত ঈসা ইবন মরিয়ম (আ.) আল্লাহর দরবারে তাঁর উম্মতের জন্য খাদ্যের আবেদন করে বলেন,

“হে আল্লাহ! আমাদের প্রতি আকাশ হতে খাদ্যভরা খাঞ্চা নাজিল করুন, যা আমাদের এবং আমাদের পূর্ববর্তী এবং পরবর্তীদের জন্য হবে ঈদস্বরূপ এবং আপনার পক্ষ হতে হবে এক নিদর্শন।

আর আমাদের জীবিকা দান করুন, আপনিই তো সর্বোত্তম জীবিকাদাতা।” (সূরা মায়িদা:১১৪)

সূরা ইউনুসের ৫৮ নং আয়াতে বলা হয়েছে, “হে নবী! আপনি বলে দিন, আল্লাহ পাকের ফজল ও রহমত প্রাপ্তিতে তারা যেন আনন্দ প্রকাশ করে; তারা যা পুঞ্জীভূত করে, তা অপেক্ষা এটা উত্তম।

” আয়াতের তাফসিরে ইবনে জারীর তাবারি উল্লেখ করেছেন, হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘ফজল’ দ্বারা ইসলাম ও ‘রহমত’ দ্বারা আলকুরআন বুঝানো হয়েছে।

হাদিসে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) প্রসঙ্গ :

হাদিসে ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উদযাপন সম্পর্কে সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা সিহাহ্ সিত্তা কিতাবে বিধৃত হয়েছে।

ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) উপলক্ষে বিশেষ আমল, শুকরিয়া, দরুদ শরীফ, মিলাদকিয়াম, সিরাত পর্যালোচনার আমল সাহাবায়ে কিরামদের মাঝে দেখতে পাই।

মিলাদ সম্পর্কে সহিহ্ মুসলিম (মিসর) ২২/৮১৯এর হাদিসে হযরত আবু কাতাদা আল আনসারী (রা.) বলেন, সোমবার দিন রোজা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়।

তিনি বলেন, “এইদিনে (সোমবার) আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এইদিনেই আমি নবুয়ত পেয়েছি।” ইমাম আহমদ (র.) তাঁর মুসনাদে সহিহ (৪/১৭২/১৭৩/২৫০৬) বর্ণনা করেছেন।

হজরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ সা. সোমবারে জন্মগ্রহণ করেন, সোমবারে ইন্তেকাল করেন, সোমবারে মক্কা থেকে হিজরত করেন, সোমবারে মদীনা পৌঁছান, সোমবারেই হাজরে আসওয়াদ উত্তোলন করেন।

আ’মে মিলাদুন্নবী (সা.) সম্পর্কে তিরমিজী শরীফে (৫/৫৫০৩৬১৯) হজরত কায়স ইবনে মাখরামা (রা.) বলেন, আমি ও রাসূলুল্লাহ (সা.) দু’জনই হাতীর বছরে জন্মগ্রহণ করেছি।

হজরত উসমান ইবনে আফফান (রা.) কুবাশ ইবনে আশইয়ামকে প্রশ্ন করেন, আপনি বড় না রাসূলুল্লাহ (সা.) বড় (বয়স)? তিনি উত্তরে বললেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) ‘হাতীর বছর’ জন্মগ্রহণ করেছেন।

ঐতিহাসিক মতে এ বছর ৫৭০ বা ৫৭১ ঈসায়ী সাল। রাসূলুল্লাহ (সা.)এর জন্মদিন সম্পর্কে ঐতিহাসিক ইবনে হিশাম, ইবনে সা’দ, ইবনে কাসীর, কাসতালানী ও অন্যান্য ঐতিহাসিক, মিলাদুন্নবী ও সীরাতুন্নবী লেখকগণ ঐতিহাসিক তথ্যসূত্রে নানা মত দিয়েছেন।

কারো মতে তিনি মুহররম মাসে জন্মগ্রহণ করেছেন। কারো মতে তিনি রবিউল আউয়াল মাসের ২ তারিখে জন্মগ্রহণ করেন।

দ্বিতীয় হিজরি শতকের অন্যতম ঐতিহাসিক ও মাগাজী প্রণেতা মুহাদ্দিস আবু মাশার নাজীহ ইবনে আবদুর রহমান আস সিনদী (১৭০ হি.) এই সালটি গ্রহণ করেছেন।

আল্লামা কাসতালানী ও জারকানী জন্ম তারিখ হিসেবে ৮ তারিখ গ্রহণ করেছেন।

মিলাদুন্নবীর উপর প্রথম ঐতিহাসিক গ্রন্থ রচনাকারী আল্লামা আবুল খাত্তার ইবনে দেহিয়া (৬৩৩ হি.) ‘আততানবীর ফী মাওলিদিল বাশির আন নজীর’ গ্রন্থে এই মতটিকে গ্রহণ করেছেন।

ঐতিহাসিক মুহাম্মদ ওমর আলওয়াকেদী (২০৭ হি.) ১০ তারিখ এবং ইবনে সা’দ তাঁর বিখ্যাত ‘আত তাবাকাতুল কুবরা’এ ২ ও ১০ তারিখ উল্লেখ করেছেন।

ইবনে হিশাম তাঁর আসসীরাতুন নাবাবীয়াহ (মিসর, ১ম সংস্করণ ১৯৮৭) ১/১৮৩তে দ্বিতীয় হিজরির প্রখ্যাত

ঐতিহাসিক মুহাম্মদ ইবনে ইসহাক (১৫১ হি.) জন্ম তারিখ ১২ রবিউল আউয়াল গ্রহণ করেন, যা ইবনে কাসীর হজরত জাবির ও ইবনে আব্বাস (রা.) থেকে গ্রহণ করেন।

রাসূলুল্লাহ (সা.)সহ হজরত আমের আনসারী (রা.)এর ঘরে গমন করে দেখতে পেলেন যে,

আবু আমের আনসারী (রা.) তাঁর নিজ সন্তানাদিসহ অন্যান্য আত্মীয়স্বজনকে একত্রিত করে রাসূলুল্লাহ (সা.) বিলাদাতের বিবরণী শুনাচ্ছেন।

তাঁর এ কাজে আল্লাহর রাসূল (সা.) অত্যন্ত আনন্দ অনুভব করলেন এবং বললেন,

হে আমের ! নিশ্চয়ই আল্লাহতোমার জন্য তাঁর রহমতের দ্বার উন্মুক্ত করেছেন এবং ফিরিশতাকুল তোমার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছেন।

যারা তোমার মতো এরূপ আমল করবে, তারাও পরিত্রাণ পাবে। (হাকীকাতে মুহাম্মাদী, পৃ২৬৩)।

তাই ঈদে মিলাদুন্নবীর দিনে শরীয়তসম্মত আমল করি। আল্লাহপাক আমাদের সঠিক ও সহিহ ধারণা দান করুন।

ঈদে মিলাদুন্নবী (সা.) পরিভাষায় বলা যায় , হজরত মুহাম্মদ (সা.) এর শুভাগমন স্মরণে খুশি প্রকাশ করে মিলাদ শরিফ মাহফিলের ব্যবস্থা করা,

শানমান, মর্যাদামর্তবা আলোচনা করা, কোরআন তেলাওয়াত, দরুদ শরিফ পাঠ, তাওয়াল্লুদ বা জন্মকালীন ঘটনা মজলিস করে আলোচনা করা,

দাঁড়িয়ে সালাম, কাসিদা বা প্রশংসামূলক কবিতা, ওয়াজনসিহত, দোয়ামোনাজাত, সম্ভব মতো মেহমান নেওয়াজির সংক্ষিপ্ত অনুষ্ঠান করা।

মহানবী (সা.) এর জন্মদিন সম্পর্কে আল কোরআনে আলোচনা করা হয়নি। কিন্তু হাদিস শরিফে মহানবী (সা.) এর জন্মকাল সম্পর্কে জানা যায়।

হজরত আবু কাতাদা আল আনসারি (রা.) বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) কে সোমবার দিন রোজা রাখা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলে তিনি বলেন,

‘এ দিনে (সোমবারে) আমি জন্মগ্রহণ করেছি এবং এ দিনেই আমি নবুয়ত পেয়েছি।’ (মুসলিম)

ঐতিহাসিক মুহাম্মদ বিন ইসহাক (রহ.) এর মতে, রাসূল (সা.) হাতি সালের (৫৭০ খ্রি.) রবিউল আউয়াল মাসে ১২ তারিখ সোমবার জন্মগ্রহণ করেন। (আররউজুল উনুফ ২৭৬/১)।

নবী করিম (সা.) সোমবার রোজা রেখে নিজের জন্মদিন স্মরণ করতেন। এর দ্বারা ঈদে মিলাদুন্নবী পালনের বৈধতা ও গুরুত্ব প্রমাণিত হয়।

তারপরও কিছু লোক ঈদে মিলাদুন্নবী পালন সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করেন।

তাদের জবাবে কোরআন মজিদ থেকে কয়েকটি দলিল পেশ করা হলো,

যাতে প্রমাণিত হয় যে, আল্লাহ তায়ালা নবীরাসূলদের জন্ম ও মৃত্যুদিবস স্মরণ করার হুকুম দিয়েছেন

আর সিএন ২৪বিডি™: ০১৫৭ ঘণ্টা, ২০ নভেম্বর